| প্রকাশ: ১২:৩৩:২২ AM, শনিবার, এপ্রিল ২০, ২০১৯ | |
চারপাশে নদী। মাঝখানে জেগে ওঠা বিশাল চর। এর নাম-দমারচর। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এ চরের অবস্থানÑ নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপের পুবে জাহাজমারা-মোক্তারিয়া চ্যানেলের পাশে। চরের কিছু অংশ ম্যানগ্রোভ বন। বাকিটা কাদাবালু। তবে কোনো মানুষের বসতি নেই। শুধু বসবাস করছে অসংখ্য গরু-মহিষ। পাশাপাশি শীত মৌসুমে এ চরে দেশি গাঙচষাসহ নানা প্রজাতির অসংখ্য জলচর পরিযায়ী পাখি বসবাস করে। জলচর এ পাখিদের শুমারি বা গণনা করতে পাখিবিদ ইনাম আল হকের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরে প্রতি শীত মৌসুমে এ চরে হাজির হই। তবে আজ তোমাদের পাখিশুমারি বা পাখির গল্প শোনাব না। শোনাব ‘বাথাইন্না’দের গল্প। তোমরা ভাবছ বাথাইন্না আবার কোন জিনিস? তাহলে চলো মূল গল্পে যাই।
আসলে চরে যারা গরু-মহিষ চরায় তাদের স্থানীয় ভাষায় বাথাইন্না বলে। এ বাথাইন্নাদের অধিকাংশই বয়সে শিশু। চরের আশপাশের অনেক দূরের গ্রাম থেকে বাথাইন্নারা এ চরে আসে শুধু গরু-মহিষ চরাতে। এটা তাদের চাকরি বলতে পারো। আমাদের অনেকে যেমন বিদেশে বা শহরে গিয়ে চাকরি করে, তেমনি চরে গরু-মহিষ চরানোটা বাথাইন্নাদের চাকরি। গরু-মহিষের মালিকরা বাথাইন্নাদের বছরভিত্তিক চুক্তি করে রাখেন। এর জন্য ওরা বছর হিসেবে টাকা পায়। ওরা বাড়ি যায় মাস কিংবা বছর পর। এই মাস বা বছর বাথাইন্নারা চরে একা একাই থাকে। চরের এক কোণে অস্থায়ী কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকে। খাওয়ার চালডাল, তেল-নুনসহ রান্না-বান্নার প্রায় সব জিনিস ওরা বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। ওরা বৃষ্টিতে ভিজে আবার রোদে শুকায়। অসুখ হলে ওদের দেখারও কেউ থাকে না। আমাদের সঙ্গে পরিচয় হয় জিহাদ বাথাইন্নার সঙ্গে। ওর বয়স ১৪। জিহাদের সঙ্গে কথা হয় ওর সারাদিনের কাজ ও পরিবার নিয়ে। তখন দুপুর। জোয়ারের পানি বাড়ায় পাখি দেখার বিরতি দিই আমরা। নৌকায় না ফিরে জিহাদকে বলি তার সঙ্গে খাব। জিহাদ আমাদের জন্য রান্না করল। সাদা ভাত আর আলু দিয়ে ডিমের তরকারি। খাওয়া শেষে ওর সঙ্গে গল্প করি।
জিহাদ জানাল, ও কোনোদিন স্কুলে যায়নি। মানুষবিহীন এ চরে ওর কথা বলার একমাত্র সঙ্গী গরু-মহিষ। সকালে গরু-মহিষ ছাড়ে। আবার বিকেলে সেগুলো জড়ো করে। এর ফাঁকেই চলে ওর রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া। গোসল করে নদীর পানিতে। খায়ও নদীর পানি। অবসর ওর নেই বললেই চলে। কোনো বিনোদনও নেই। তবে চরের অন্য বাথাইন্নানারা ওর কাছে মাঝে মধ্যে আসে বা ও যায় খেলার জন্য। অবশ্য বিশাল এ চরে একেক বাথান্নাইনার থাকার জায়গা বা গরু-মহিষ চরানোর জায়গা অনেক দূরে দূরে।
জিহাদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই এলো বাথাইন্না মোতালেব, মামুন ও রফিক। ওদের বয়সও জিহাদের মতো। ওরাও জানাল, ওরা স্কুলে যায়নি কোনো দিন। ওদের মা-বাবা সামান্য কিছু টাকার জন্য ওদের এ মানুষশূন্য চরে পাঠিয়েছে। এটা ওদের অন্য এক জীবন। ঘর নেই, আলো নেই, বিনোদন নেই, কাছের মানুষ নেই। ঝড়-বন্যা মাথায় নিয়ে ওরা এখানে থাকে বারো মাস। ওদের বেতন বছরে ১০ হাজার টাকা করে। অবশ্য থাকা-খাওয়া মালিকের। এ বেতনের জন্যই ওরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে বাড়িঘর ও আপনজন ছেড়ে এ চরে থাকে। অবশ্য বেতনের টাকাও মালিকরা বাথাইন্নাদের বাবা-মার হাতে দেয়।
বাথাইন্নারা জানাল, গরু-মহিষের মালিকরা থাকেন লোকালয়ে। তারা মাঝে মধ্যে গরু-মহিষ ও ওদের খোঁজ নিতে আসেন। ওদের এ চরে থাকতে ইচ্ছে করে না। ওদেরও মন চায় বাবা-মার সঙ্গে, ভাই-বোনের সঙ্গে থাকতে। মন চায় লেখাপড়া করতে।
ওদের কথা শুনে আবার বের হই পাখি দেখতে। সন্ধ্যায় যখন পাখি দেখে ফিরছি ট্রলারে। তখন ওদের সঙ্গে আবার দেখা। অনেকদিন পর ওরা কারও সঙ্গে কথা বলল। তাই আমরা চলে আসার সময় ওদের কোমল মুখটা যেন করুণ হয়ে ওঠে। মনে হলো ওরা আমাদের অনেক চেনা, অনেক কাছের মানুষ। ওদের বললাম, আমাদের সঙ্গে যাবে? তোমাদের বাড়ি পৌঁছে দেব। ওরা বলল, না, বাড়িতে গেলে মালিক মারবে, বাবা-মা মারবে, আবার ধরে পাঠিয়ে দেবে।
আমাদের ট্রলার ছাড়ে। দূরে ওদের মুখ আস্তে আস্তে আবছা হয়ে আসছে। ওরা এখন হারিক্যান জ্বালাবে ওদের কুঁড়েঘরে। এর পর ঘুম। সকাল থেকে আবার গরু-মহিষের সঙ্গে সারাদিন থাকতে হবে।
ছবি : লেখক
![]() সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected] |