logo
প্রকাশ: ০১:১১:২২ AM, বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৬, ২০২০
যেমন কর্ম তেমন ফল
শায়খ ড. আবদুল মুহসিন বিন মুহাম্মদ আল কাসেম

আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টিলোককে খুব সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টির পরিচালনা ও সমন্বয় বিধানে তার দ্বীন ও শরিয়তকে করেছেন প্রজ্ঞাপূর্ণ। তিনি প্রজ্ঞাবান, জ্ঞানী, সর্বজ্ঞ এবং দয়াবান। তার সৃষ্টিতে এবং কাজে শাশ্বত নীতি রয়েছে, যা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হওয়ার নয়। তাঁর নিয়ম-নীতির একটি হচ্ছে বান্দার আমল অনুযায়ী তার প্রতিদান প্রদান করা। যদি ভালো হয় তো প্রতিদান ভালো, আর যদি মন্দ হয়, তাহলে মন্দ। যথাযথ ও উপযুক্ত প্রতিদান। শরিয়ত বিষয়টি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে থাকলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করে থাকলে তাও দেখতে পাবে।’ (সূরা জিলজাল : ৭-৮)। কল্যাণময় কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা সব আমলের জন্য এর যথাযথ ও সাদৃশ্যপূর্ণ সওয়াব এবং প্রতিদানের ব্যবস্থা রেখেছেন। অতএব প্রতিদান নির্ণীত হবে আনুগত্যের ভিত্তিতে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রা.) বলেন ‘প্রতিদান সবসময় আমলের ধরন অনুপাতেই হয়। যে ভালো কাজ করবে তার জন্য ভালো।’ আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘ভালোর প্রতিদান ভালো ছাড়া আর কী হতে পারে।’ (সূরা রহমান : ৬০)। অতএব যে আল্লাহর সীমা ও অধিকার সংরক্ষণ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে উভয় জগতে হেফাজত করবেন। রাসুল (সা.) বলেন ‘তুমি আল্লাহর আদেশের মর্যাদা রক্ষা কর, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে হেফাজত করবেন।’ (তিরমিজি)। 
বান্দা যখন আন্তরিকভাবে হেদায়েত প্রার্থনা করে আল্লাহ তায়ালা তাকে হেদায়েত দান করেন এবং তাতে তাকে অবিচলতা দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘যারা সৎপথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাদের হেদায়েত আরও বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদের তাকওয়াপূর্ণ জীবনের তৌফিক দান করেন।’ (সূরা মুহাম্মদ : ১৭)। আল্লাহ তায়ালার অঙ্গীকার পূরণ করা তাঁর প্রতি এবং রাসুল (সা.) এর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। এর প্রতিদান হচ্ছে অঙ্গীকার রক্ষাকারীকে জান্নাত প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহ অঙ্গীকার পূর্ণ করবেন। তিনি বলেন ‘আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার ওয়াদা পূর্ণ করব।’ (সূরা বাকারা : ৪০)। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে সে যা ভালোবাসে, তা দিয়ে সম্মানিত করবেন এবং এর চেয়েও বেশি দেবেন। রাসুল (সা.) বলেন ‘যদি তুমি আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণ কর, তাহলে তিনি তোমার সঙ্গেও সততাপূর্ণ আচরণ করবেন।’ (নাসাঈ)। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন ‘বান্দার জন্য তার পালনকর্তার সঙ্গে নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণের চেয়ে উপকারী আর কিছু নেই। আর যে ব্যক্তি তার সবকিছুতে আল্লাহর সঙ্গে সততার পরিচয় দেবে আল্লাহ তায়ালা সাধারণত অন্যদের জন্য যে প্রতিদান প্রস্তুত করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি তার জন্য প্রস্তুত করে রাখেন। 
আর বান্দা ইবাদত, আনুগত্য প্রভৃতির মাধ্যমে যে পরিমাণ আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চাইবে তার জন্য আল্লাহ তায়লার নৈকট্য তার চেয়ে বেশি অবারিত হবে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘যখন বান্দা আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে যখন আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে আমি তার দিকে এক গজ এগিয়ে যাই।’ (বোখারি, মুসলিম)। 
বান্দা তার পালনকর্তার ব্যাপারে যেরূপ ধারণা করবে, তেমন ফল পাবে। যদি ভালো ধারণা পোষণ করে, তাহলে ভালো ফল পাবে, আর যদি মন্দ ধারণা পোষণ করে, তাহলে অনুরূপ ফল পাবে। আল্লাহ তায়ালা হাদিসে কুদসিতে বলেন ‘আমি আমার বান্দার সঙ্গে তার ধারণা অনুযায়ী আচরণ করি।’ (বোখারি)। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও আল্লাহর একত্বকে মেনে দুনিয়ায় ভালো কাজ করবে তার জন্য আখেরাতে জান্নাত এবং আল্লাহ তায়ালার দর্শন মিলবে। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং আরও বেশি।’ (সূরা ইউনুস : ২৬)। 
নামাজের জন্য জান্নাতে রয়েছে বিশেষ দরজা। নামাজিকে সেই দরজা দিয়ে ডাকা হবে। পবিত্রতা অর্জনে অজুর সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধোয়ার ফলে সৃষ্ট উজ্জ্বলতার মাধ্যমে কেয়ামত দিবেসে এ উম্মতকে চেনা যাবে। রাসুল (সা.) বলেন ‘কেয়ামতের দিন অজুর কারণে আমার উম্মতের হাত-পা ও মুখমণ্ডল উজ্জ্বল থাকবে।’ (বোখারি, মুসলিম)। ‘অজুর পানি যে পর্যন্ত পৌঁছে মোমিনের উজ্জ্বলতাও সে পর্যন্ত পৌঁছাবে।’ (মুসলিম)। মুয়াজ্জিন আজানের ধ্বনিতে তার আওয়াজাকে উঁচু করেন; তাই তার প্রতিদানও সমশ্রেণির হবে। অর্থাৎ তার গর্দানকে উঁচু করে দেওয়া হবে। রাসুল (সা.) বলেন ‘কেয়ামত দিবসে মানুষের মাঝে মুয়াজ্জিনরাই সর্ববৃহৎ ঘাড়ের অধিকারী হবে।’ (মুসলিম)।
জিন, ইনসান, গাছ ও পাথর যারাই মুয়াজ্জিনের আওয়াজ শুনতে পাবে তারা কেয়ামত দিবসে তার জন্য সাক্ষ্য দেবে। (বোখারি)। আল্লাহর নির্দেশ হলো, মসজিদে যেন আল্লাহ তায়ালার জিকির আর তাঁর নাম উচ্চারিত হয়, উঁচু হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মসজিদ বানাবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে ঘর বানিয়ে দেবেন।’ (মুসলিম)।
সদকা হচ্ছে ঈমানের প্রমাণস্বরূপ। সদকা আল্লাহর কাছে দ্বিগুণ বদলা পাওয়ার ঋণ। যে ব্যক্তি কোনো কিছু দান করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে এর থেকে উত্তম প্রতিদান দান করবেন। রাসুল (সা.) বলেনÑ ‘বান্দার যখন প্রতিদিন সকাল হয়, তখন দুজন ফেরেশতা নাজিল হয়। তাদের একজন বলে, হে আল্লাহ দানশীলকে আপনি উত্তম প্রতিদান দিন। অন্যজন বলে, হে আল্লাহ যে দান করে না, কৃপণতা দেখায় তাকে বঞ্চিত করুন।’ (বোখারি, মুসলিম)। 
রোজাদারদের রাইয়ান নামক বিশেষ দরজা দিয়ে ডাকা হবে। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার কাছে মিশকের চেয়েও পবিত্র। যে ব্যক্তি মুহরিম অবস্থায় ইন্তেকাল করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উঠাবেন। আল্লাহর জিকির অন্তরকে জাগিয়ে তোলে ও দেহ-মনকে শক্তিশালী করে। আল্লাহর জিকিরকারীদের উত্তম প্রতিদান হচ্ছে, স্বয়ং আল্লাহ তাদের স্মরণ করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। যে ব্যক্তি কোনো অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহ তায়ালা আরও উত্তম অবস্থায় তাকে স্মরণ করেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকি। যদি সে একাকী আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে একা স্মরণ করি। আর যদি সে জনসমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে এর চেয়ে উত্তম সমাবেশে স্মরণ করি।’ (বোখারি, মুসলিম)।
আল্লাহ তায়ালার জিকিরের মজলিস জান্নাতের বাগানের মতো; বান্দার জন্য এ বাগান থেকে ততটুকুই রয়েছে, যতটুকুতে তারা অংশগ্রহণ করেছে। হাদিসে এসেছে তিন ব্যক্তি রাসুল (সা.) এর কাছে আগমন করলেন, অতঃপর একজন মজলিসের মধ্যে কিছুটা খালি জায়গা দেখে সেখানে বসে পড়লেন, অপরজন তাদের পেছনে বসলেন, আর তৃতীয়জন ফিরে চলে গেলেন। রাসুল (সা.) বললেন আমি কি তোমাদের এ তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলব না? তাদের একজন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করল, আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিলেন। অপরজন লজ্জাবোধ করল, আল্লাহও তার ব্যাপারে লজ্জাবোধ করলেন। আর অন্যজন মুখ ফিরিয়ে নিল, আল্লাহও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। (বোখারি, মুসলিম)। 
আর দ্বীনি ইসলামি হচ্ছে তার অনুসারীদের জন্য সম্মান ও মর্যাদার কারণ। যে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করে, সে নিজেও সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘আর অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে।’ (সূরা হজ : ৪০)। যে ব্যক্তি কোনো সৎকাজের উপদেশ দেয়, তার জন্য কাজটি সম্পাদনকারীর মতো সওয়াব বরাদ্দ হবে, আর যে কোনো ভালো কিছুর প্রচলন ঘটাবে, সে এর প্রতিদান পাবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা এ আমল করবে, তাদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। 
সৃষ্টির ওপর বিভিন্ন বালামুসিবত আসা আল্লাহর রীতি। বিপদ যত বড় হবে, প্রতিদানও তত মহান হবে। অতএব যে এক্ষেত্রে সন্তুষ্ট, তার জন্য সন্তুষ্টি, আর যে অসন্তুষ্ট, তার জন্য অসন্তুষ্টি। আদেশ, নিষেধ ও তকদিরের বিষয়ে ধৈর্যধারণ করা অপরিহার্য। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীল রাখেন। যে ব্যক্তি তার স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ রাখে, আল্লাহ তাকে তার কঠিন সময়ে স্মরণ রাখেন। প্রচেষ্টার দ্বারাই ইলম অর্জন করা হয়। যে জ্ঞান অন্বেষণের পথে বের হবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আল্লাহ তায়ালা যাকে তওবার তৌফিক দেন এবং সে তওবা করে ফিরে আসে, আল্লাহ তায়ালা তার তওবা কবুল করেন এবং তাকে প্রতিদান দেন। আল্লাহ বলেনÑ ‘জুলুম করার পরও যে তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে, তখন নিশ্চয়ই আল্লাহ তা গ্রহণ করেন।’ (সূরা মায়েদা : ৩৯)। 
মোমিনের যখন মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার বদান্যতার সুসংবাদ দেওয়া হয়। এ অবস্থায় তার কাছে আল্লাহর সাক্ষাতের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু থাকে না। তখন সে আল্লাহর সাক্ষাৎকে পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎকে পছন্দ করেন। সৃষ্টির সঙ্গে যে উত্তম আচরণ করে, আল্লাহও তার সঙ্গে দুনিয়া ও আখেরাতে অনুরূপ আচরণ করেন। সৃষ্টির সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)। যে তাঁর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করেন। আনসারদের মোমিনরাই ভালোবাসেন। আর যারা তাদের ভালোবাসেন, আল্লাহও তাদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তায়ালা তার দয়াবান বান্দাদের দয়া করেন। রাসুল (সা.) বলেন ‘যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, তাকে দয়া করা হবে না।’ (বোখারি, মুসলিম)।  জনৈকা বেশ্যা নারী একটি কুকুরকে দয়া করে পানি পান করিয়েছে; তাই আল্লাহ তাকে দয়া করলেন এবং ক্ষমা করে দিলেন। এ ঘটনা হাদিসে সবিস্তারে বর্ণিত।
ভালো ব্যবহার পাওয়ায় অগ্রাধিকার আত্মীয়স্বজন। যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে, আল্লাহও তার সঙ্গে নিজ সম্পর্ক বজায় রাখেন। মানুষকে সালাম প্রদানে রয়েছে নিরাপত্তা ও শান্তি। রাসুল (সা.) বলেন ‘তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, নিরাপদ থাকবে।’ (ইবনে হিব্বান)।

১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ মুহিউদ্দীন ফারুকী

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]