| প্রকাশ: ০৬:৪৮:৩৮ AM, বুধবার, জানুয়ারী ২২, ২০২০ | |
আরবি ‘ইস্তেমা’ শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে শ্রবণ-শোনা, মনোযোগসহ শ্রবণ। আর ‘ইজতেমা’ মানে হচ্ছে সম্মেলন, সাক্ষাৎ, বৈঠক, সভা, সমাবেশ, সম্মেলন, সমাজ, সমাজবদ্ধতা, সামাজিকতা, সমাজজীবন। শব্দ দুটির অর্থের প্রতি মনোযোগ দিলে বিশ্ব ইস্তেমা ও বিশ্ব ইজতেমা বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ বিশ্ব মুসলিমের মনোযোগসহ শোনার বিষয় বা অনুষ্ঠান; বিশ্বের মুসলমানদের সম্মিলন বা সম্মেলন বা সভা-সমাবেশ-বৈঠক। তবে ইস্তেমা এর স্থলে ইজতেমা শব্দটি অধিক উপযোগী। এছাড়া, যেহেতু পরিচিত বিশ্বের অনেক বা বেশিরভাগ দেশই এতে অংশগ্রহণ করে, তাই এটিকে বিশ্ব ইজতেমা বলতে দোষের কিছু নেই।
‘দাওয়াত’ আরবি শব্দটির অর্থ হচ্ছে, ডাক, আহ্বান ও প্রচার। ‘তাবলিগ’ শব্দটিও আরবি। এর মানে হচ্ছে, প্রচার, ঘোষণা বা পৌঁছে দেওয়া। দ্বীনি দাওয়াত তথা ধর্মের বাণী প্রচার করা বা পৌঁছে দেওয়া। সুতরাং সহজবোধ্যভাবে আমরা বলতে পারি, দাওয়াত ও তাবলিগ, ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং ইসলামের বাণী-পয়গাম সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া, ছড়িয়ে দেওয়া।
ইসলাম ধর্মের মৌলিক ও সেবামূলক যত কাজ আমরা করে থাকি তার সবগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে মুসলমানদের ঈমান-আমল, তাকওয়া-পরিশুদ্ধি, সততা ও যোগ্যতা অর্জিত হয়ে যেন আমরা ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানে সফল ও সোনার মানুষ হতে পারি। আর এ লক্ষ্যে পরিচালিত মসজিদ-মাদ্রাসা, খানকা, নায়েবে নবী, হক্কানি আলেম, ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ, ইমাম-খতিব-বক্তা ও দাঈগণ এক কথায় সবার মেহনত, তৎপরতার অবদান ও সফলতা অনস্বীকার্য এবং কমবেশি সবাই প্রশংসার যোগ্য। অবশ্য, এটি লক্ষণীয় যে, এদের সবার ঈমান-আমল-তাকওয়া ও খাঁটি মুসলমান বানানোর যৌথ মেহনতের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে জড়িতরা মৌলিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার দিকটিকে যেমন প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, তেমনি পীর-মাশায়েখরা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর পরিচয়-প্রেম-ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। একইভাবে তাবলিগ সংশ্লিষ্টরা দাওয়াতের মেহনতের প্রতি অধিক জোর দিয়ে থাকেন। মহান আল্লাহ সবার মেহনত ও সেবাকে কবুল করুন।
বাস্তবতার নিরিখে বিচার করতে গেলে বলতে হবে, বর্তমানকার দাওয়াত ও তাবলিগ নামে পরিচিত যে জামাতকে আমরা জানি ও চিনি, তাদের মেহনত-তৎপরতার ব্যাপকতার পাশাপাশি অল্প সময়ে সব মহলে এত অধিক সংখ্যক মুসলমানের ঈমান-আমল-তাকওয়ার দিকে পরিবর্তন, সুন্নাত-নফলের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি, সত্যিই আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দান। তারপরও, পুরো কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসকে সামনে রেখে শরিয়তের মাপকাঠিতে তাবলিগ বিষয়টিকে মূল্যায়ন করতে হবে।
আল কোরআনের বাণী অনুযায়ী যেহেতু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী-রাসুল আসবেন না; অথচ তাঁর প্রতি অবতীর্ণ সর্বশেষ ধর্ম এবং এই ধর্মের যাবতীয় বিধি-বিধান সংবলিত সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ আল কোরআন কেয়ামত পর্যন্ত আগত তামাম বিশ্ববাসীর হেদায়েত প্রাপ্তির সর্বশেষ মূল উৎস। তাই এ ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের বাণী, তার আহ্বান বিশ্ব মানবতার দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া এবং এর প্রচার-প্রসার একমাত্র দাওয়াত ও তাবলিগের মাধ্যমেই সম্ভব। এ থেকে দাওয়াত ও তাবলিগের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য সহজেই অনুমেয়।
পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করলে আমরা দাওয়াত ও তাবলিগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আরও অধিক উপলব্ধি করতে পারব। উদাহরণত ১. আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখবে।’ (সূরা ইমরান : ১১০)। ২. তিনি আরও এরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একদল থাকতে হবে, যারা ভালো কাজের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকর্মের নির্দেশ দেবে ও অসৎকর্মে নিষেধ করবে; আর এরাই সফলকাম।’ (সূরা ইমরান : ১০৪)। ৩. মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘ওই ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম, যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, নেক আমল করে এবং বলে, আমি তো অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা হা-মিম : ৩৩)। ৪. তিনি আরও বলেন, ‘আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ উপদেশ মোমিনদের উপকারে আসে।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৫)। ৫. তিনি আরও বলেন, ‘আর আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ দিন এবং তাতে নিজেও অবিচল থাকুন।’ (সূরা ত্বহা : ১৩২)।
উপরোক্ত সব আয়াত থেকেই আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, কল্যাণের দিকে ডাকা, সৎকাজে আদেশ দান, অসৎকাজে নিষেধ করা, নামাজের নির্দেশদান ইত্যাদি যা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এসবই প্রকারান্তরে দাওয়াত ও তাবলিগের অন্তর্গত। উল্লেখ্য, ব্যক্তি ও অবস্থাভেদে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের দায়িত্ব অর্থাৎ তাবলিগ করা ফরজ। (আহসানুল ফাতাওয়া : খ-১, পৃ-৫১২)। এ ফরজ মৌলিক বিবেচনায়, অর্থাৎ সত্য-সঠিক ধর্ম ইসলাম, বিশ্বমানবতার জন্য বিশ্বপ্রভুর একমাত্র মনোনীত জীবনব্যবস্থা, তিনি তা মহাপ্রলয় পর্যন্ত বাকি রাখবেন, অক্ষুণ্ন রাখবেন এই তাবলিগের মাধ্যমেই। সুতরাং তা ফরজ হওয়াই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তবে অবস্থাভেদে ওই দায়িত্ব পালনে তারতম্য হতে পারে যেমন, ফরজের তাবলিগ ফরজ, ওয়াজিবের তাবলিগ ওয়াজিব, সুন্নতের তাবলিগ সুন্নত ও নফলের তাবলিগ নফল।
একইভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে যিনি যতটুকু সহিহ জ্ঞান রাখেন, তার ওপর ততটুকু তাবলিগ করা জরুরি; এবং সামর্থ্য অনুসারে নিজের অধীন, আওতাভুক্ত বা আওতাবহির্ভূত ক্ষেত্রে ও পরিবেশের বিবেচনায় ‘তাবলিগ’ ফরজও হতে পারে, ওয়াজিবও হতে পারে, সুন্নত-মুস্তাহাবও হতে পারে। আবার সহিহ জ্ঞান না থাকলে বা যথাযথ পন্থা-পদ্ধতি অজ্ঞাত হলে কিংবা স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনা করার মতো যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা না থাকলে কিংবা হিতে বিপরীত হওয়ার মতো পরিবেশ হলে; সেক্ষেত্রে বরং তাবলিগ না করাই বিধেয় হবে।
ফরজ তাবলিগ দুই ধরনের। যথা : ফরজে আইন ও ফরজে কেফায়া। ফরজে আইন : তাবলিগ হচ্ছে ওই তাবলিগ যা প্রত্যেক মুসলমানকে করতে হয়। আর তা প্রযোজ্য হয়ে থাকে নিজ অধীন ও পরিবারের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যাদের ভালোমন্দ দায়-দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং ভরণ-পোষণ ইত্যাদি নিজের ওপর বর্তায়। উদাহরণত, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রমুখ অথবা পরিবার-সমাজ, অফিস-আদালত, দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের যে যে ক্ষেত্রে তার দায়-দায়িত্ব আছে এবং যেখানে যারা তার অধীন আছে বা তার নিজের সংশ্লিষ্টতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ফরজে আইন প্রযোজ্য হয়ে থাকে।
ফরজে কেফায়া তাবলিগ হচ্ছে ওই তাবলিগ যা সরাসরি উপরোক্তভাবে ব্যক্তির নিজের ওপর বর্তায় না বটে; তবে পরোক্ষভাবে প্রতিবেশী হিসেবে, সমাজ হিসেবে, স্বজন হিসেবে; দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ তথা তাবলিগ করা ফরজে কেফায়া হিসেবে প্রযোজ্য ও দায়িত্বভুক্ত হয়ে যায়; এবং তার প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থ্যও বিদ্যমান থাকে।
গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে, কোরআন ও হাদিসের প্রায় সর্বত্রই সৎকাজের আদেশের পাশাপাশি অসৎকাজে নিষেধের নির্দেশ সমান্তরালে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং অসৎকাজে নিষেধ বাদ দিয়ে শুধু সৎকাজে আদেশ দানের তাবলিগ করলেই ওই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ফরজ দায়িত্ব পালিত হয়েছে বলে গণ্য হবে না। দুটি দায়িত্বই পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হবে। অবশ্য অসৎকাজে নিষেধের তাবলিগকালীন (আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা-কৌশলের মাধ্যমে এবং উত্তম উপদেশ দ্বারা আহ্বান করুন) আয়াতের আলোকে নম্রভাবে, দয়ার্দ্র হয়ে, সংশ্লিষ্টদের কল্যাণ চিন্তায়, কৌশলী পন্থা অবলম্বন করে তাবলিগ করতে হবে। সুতরাং এমন চিন্তা ও বক্তব্য যে ‘অসৎ কাজে নিষেধ করতে গেলে হিংসা, হঠকারিতা ও অসন্তোষ জন্ম নিতে পারে; তাই শুধু সৎকাজে আদেশদানের মধ্যেই তাবলিগকে সীমিত রাখতে হবে’ এমন ধারণা আদৌ সঠিক নয়।
লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
![]() সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected] |