| প্রকাশ: ০২:০২:০৫ AM, বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৩, ২০২০ | |
প্রচণ্ড গরমের পর কষ্টদায়ক শীতের আগমন ঘটেছে। তাপদাহের পর শীতের তীব্রতা নেমে এসেছে। আপনাদের মাঝে গ্রীষ্মের দহনের পর কনকনে ঠান্ডা ও শীত উপস্থিত হয়েছে। ‘আল্লাহই রাত ও দিনের পরিবর্তনকারী। জ্ঞানীদের জন্য এতে রয়েছে উপদেশ।’ (সূরা নূর : ৪৪)। অতএব আপনারা আল্লাহর মহানুভবতা, কুদরত এবং তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন। শীত, মেঘমালা ও বৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করুন। কুয়াশা ও শিশির নিয়ে ভাবুন। দেখুন কীভাবে বিশাল মেঘমালা থেকে শিলাবৃষ্টি হয়? দেখুন শীলাবৃত পাহাড়-পর্বত ও বরফাবৃত শহর এবং শীত ও শুভ্রতা জড়ানো নগরগুলো। মহাজ্ঞানী সৃষ্টিকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন। পবিত্রতা বর্ণনা করুন মহান জ্ঞানী ও সৃষ্টিকর্তার, যিনি বিশ্ব চরাচরের সৃষ্টিকর্তা এবং আবিষ্কারক। আপনারা তো সেই আশ্চর্যজনক মহাসৃষ্টির একটি শাখামাত্র। অতএব, আল্লাহর মহানুভবতা যথাযথভাবে বর্ণনা করুন। তাঁর শাস্তি ও ক্রোধকে ভয় করুন। তাঁর অবাধ্যতা এবং তাঁর অধিকারের প্রতি অবহেলা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন থেকে বেঁচে থাকুন।
শীত তার তীব্রতা ও প্রচণ্ডতা নিয়ে অবতরণ করেছে। তাই আপনারা শীত থেকে আত্মরক্ষা করুন। কারণ তা ঘরবাড়িকে শীতল করে দেয়, দেহের ক্ষতিসাধন করে, বয়স্কদের আরও দুর্বল করে দেয়। রবি বিন দুবায়্য বলেন, ‘শীত এলে আমাকে উষ্ণতা দাও, কেননা বৃদ্ধদের শীত কাবু করে ফেলে।’ অন্য এক কবি বলেন, ‘শীত এসেছে, অথচ আমার কাছে পশমযুক্ত পোশাক নেই! শীত হলো এমন প্রতিপক্ষ যাকে ফেরানো ও বাধা দেওয়া যায় না।’
ওমর (রা.) বলতেন, ‘শীত এসেছে, যা বৈরী পরিবেশের অংশ; অতএব তোমরা এজন্য উল, চামড়ার মোজা, সাধারণ মোজা ইত্যাদি নিয়ে সতর্ক থেকো এবং উলকে শীত নিবারণের বস্ত্র বা কম্বল হিসেবে গ্রহণ করো। কেননা শীতের বৈরী প্রভাব দ্রুত আসে, বিলম্বে যায়।’
অভিভবকরা! আপনারা শিশু ও বাচ্চাদের প্রতি স্নেহশীল হোন। তাদের পর্যাপ্ত শীতের পোশাক পরিধান করান। তাদের প্রতি দয়া করুন। যারা দুর্ভাগা শুধু তাদের হৃদয় থেকেই দয়া উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেক বাবা আছেন যারা নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া বা তাকে তালাক দেওয়ার কারণে সন্তানকে পরিত্যাগ করেন। তাদের খরচ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। গরমে, শীতে বা ঈদে তাদের কোনো জামা কিনে দেন না। খরচ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন না। সুন্দরভাবে তাদের স্বীকার করেন না, তাই অন্য কেউ বা আত্মীয়রা তাকে কোনো অনুদান প্রদান করে না। এটা কোন ধরনের নিষ্ঠুরতা ও কঠোরতা? কেমন বিবেক ও চিন্তা, যা এই অত্যাচারী অর্বাচীন পিতাকে উদ্বুদ্ধ করেছে এমন আচরণ করতে?
আবদুল্লাহ বিন ওমরকে (রা.) এক আজাদকৃত দাস বলল, ‘আমি বাইতুল মুকাদ্দাসে এই এক মাস অবস্থান করতে চাই। তখন তিনি তাকে বললেন, এই এক মাস তোমার পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কিছু রেখে এসেছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর; কারণ আমি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, ‘অধীনদের ভরণ-পোষণ না দেওয়াই যথেষ্ট ব্যক্তির গোনাহ হিসেবে। (আহমাদ, আবু দাউদ)।’ আর মুসলিমে এভাবে এসেছে, ‘অধিনদের ভরণ-পোষণ দেওয়া থেকে বিরত থাকাই কোনো ব্যক্তির গোনাহ হিসেবে যথেষ্ট।’
ভাইয়েরা, আপনার একান্ত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও যদি শীতের খরচ-ব্যবস্থা না করতে পারেন, শীতের পোশাক জোগান দিতে অপারগ হন; তবে তা কতই না কষ্টদায়ক! কত হতদরিদ্র মানুষ রয়েছে যারা শীতের পোশাক, জ্যাকেট, চাদর, লেপ, কম্বল, পর্দা, খাদ্য এমনকি ওষুধপত্র নিজের বা সন্তানদের জন্য ব্যবস্থা করতে পারে না। অতএব আপনারা নিজেরা উষ্ণতা লাভের পর দুর্বল, গরিব, মিসকিন, বিধবা, এতিম ও অভাবীদের কথাও স্মরণ করুন। আশ্রয়প্রার্থী, দেশান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত, শরণার্থীদের বিষয়টি চিন্তা করুন। তারা তুষারে আক্রান্ত, বরফে গেছে ছেয়ে, প্রবল ঘূর্ণিবাতাসে মৃত্যুযাত্রী। গরিব বিলাপ করছে, দুর্বল সাহায্য চাচ্ছে, নিরুপায় ব্যক্তি আর্তনাদ করছে; তার দুটি হাত সংকুচিত হয়ে পড়েছে, তার আর্তি বিরাট হয়েছে, বাড়িতে তীব্র শীত স্থান করে নিয়েছে।
সহানুভূতি, ভালোবাসা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে মোমিনরাই অধিক নিকটবর্তী। মোমিন ফকির, মিসকিন ও এতিমদের প্রতি অধিক দয়াপ্রবণ। বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা ও দুর্বলদের প্রতি বেশি যত্নশীল। দুখী ও বিপদগ্রস্তদের সহযোগী হয়। যার কোনো আশ্রয়দাতা নেই, উদ্ধারকারী নেই; এমন ব্যক্তিদের মোমিনরাই গুরুত্ব দেন। তাদের সহযোগিতা করেন, তাদের বস্ত্র, চাদর, পর্দা ইত্যাদি ত্রাণ দেন। তাদের লেপ, কম্বল ইত্যাদি শীত নিবারণের উপকরণ সরবরাহ করেন।
যার শীত নিবারণের কিছু নেই তার জন্য অপর মুসলিম ভাই কর্তৃক সহানুভূতি, ভালোবাসা ও সদাচরণই তার জন্য মহা উষ্ণতা। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুল (সা.) এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি সওয়ারিতে আরোহণ করে তার কাছে এলো এবং ডানে-বামে তাকাতে লাগল। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘যার কাছে আরোহণের কোনো অতিরিক্ত বাহন আছে, সে যেন তা দিয়ে এমন কাউকে সাহায্য করে যার কোনো বাহন নেই। আর যার কাছে অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য আছে সে যেন তা দিয়ে ওই ব্যক্তিকে সাহায্য করে যার খাদ্যদ্রব্য নেই।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘তিনি এভাবে সম্পদের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করলেন যাতে আমরা ভাবলাম যে অতিরিক্ত সম্পদে আমাদের কারও কোনো অধিকার নেই।’ (মুসলিম)।
শীতের প্রচণ্ডতা ও কষ্টের সময়ে দান করা, জীবিকার অপ্রতুলতা, আতিথ্যদাতার অভাব এবং ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সময় আহার করানো ও দয়া করা এমন কৃতিত্ব ও সম্মানের, যা সদয় দানবীররাই অর্জন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্যদান; এতিম আত্মীয়কে বা দরিদ্র-নিঃস্ব ব্যক্তিকে।’ (সূরা বালাদ : ১৪-১৬)। ইবরাহিম নাখয়ী (রহ.) বলেন, ‘অর্থাৎ এমন দিনে আহার করানো যখন খাদ্য প্রাপ্তি কঠিন হয়ে যায়।’
মুহাম্মদ বিন আবদুস আল-মালেকী শীতের রাতে পুরো একটি বাগানের শস্যের মূল্য দান করে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন, ‘উম্মতে মুহাম্মদির দরিদ্রদের চিন্তায় আজ রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি।’ কবি তরফা বিন আব্দ বলেন, ‘শীতের সময় আমরা উন্মুক্ত ভূরিভোজের আয়োজন করতামÑ তাতে কাউকে খাস করে নিমন্ত্রণ করা হতো না।’ খানসা (রা.) তার ভাই সখরের মৃত্যুর শোকে বলেছিলেন, ‘সখর ছিল আমাদের অভিভাবক ও নেতাÑ মানুষ অভাবে পড়লে সখর অনেক উট জবাই করতেন।’
অতএব, উদার হোন। দান করুন। অভুক্ত ও ক্ষুধার্তদের খাদ্য দান করুন। পিপাসার্তদের পানি পান করান। তীব্র ও কনকনে শীতে যাদের দাঁত নড়ছে, শৈত্যপ্রবাহে যাদের হাড় কাঁপছে তাদের পোশাক সরবরাহ করুন। প্রতিবেশী, গৃহকর্মী, কর্মচারী, নিকটাত্মীয়, হতদরিদ্র ও গরিব এবং মরুভূমির রাখালদের খোঁজখবর নিন। সে প্রকৃত মোমিন নয় যে উদরপূর্তি করে খায়, আর তার প্রতিবেশী থাকে উপোস। অতএব অভাবীদের অভাব-অনটন ও প্রয়োজন পূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করুন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেউ যদি ভালো ও উত্তম কিছু সদকা করেÑ আর আল্লাহ তায়ালা উত্তম ও ভালো জিনিসই কবুল করেনÑ তাহলে দয়াময় তা ডান হাতে গ্রহণ করেন যদি তা ছোট্ট খেজুরও হয়। অতঃপর সেটা দয়াময়ের হাতে বাড়তে বাড়তে পাহাড়ের চেয়েও বড় হয়ে যায়। যেমনিভাবে তোমাদের কেউ তার বাচ্চা উট বা ঘোড়ার বাচ্চাকে লালন-পালন করে বড় করে।’ (বোখারি, মুসলিম)।
শীতে মানুষ ঠান্ডা থেকে বাঁচতে আগুনের তাপ গ্রহণ করে। তা উপভোগ করে। এর আশপাশে রাত কাটায়। বাড়িতে, বাগানে এবং তাঁবুর পাশে আগুন প্রজ্বলিত করে। এটা শীতের সময় তাদের জন্য সুস্বাদু ফলের মতো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি একে (বৃক্ষকে) করেছি এক স্মারক এবং মরুবাসীর প্রয়োজনীয় বস্তু।’ (সূরা ওয়াকিয়া : ৭৩)। তাই যে আগুন প্রজ্বলিত করে, এতে রান্না করে, রুটি বানায় অথবা আগুনে তাপ নেয়, এ থেকে উপকৃত হয় এবং প্রমোদ গ্রহণ করে ও তৃপ্তি পায় সে যেন আগুন জ্বালিয়ে অথবা কয়লা প্রজ্বলিত রেখে চলে না যায়। বরং রাতে হোক বা দিনে সে যেন তা নিভিয়ে দেয়। অন্যথায় পুড়ে যাওয়া বা ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। কেননা আগুন হচ্ছে লাগামহীন শত্রু। এর মন্দ ছড়াতে থাকে। ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরে ঘুমানোর সময় আগুন জ্বালানো অবস্থায় রেখে দিও না।’ (বোখারি, মুসলিম)। তেমনিভাবে ইলেকট্রিক হিটারের মাধ্যমে যদি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে প্রয়োজন পূরণের পর তা বন্ধ করে রাখাই সঠিক কাজ। এবং হঠাৎ দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে তার ও অন্যান্য জিনিস, কাপড়, বিছানা, কাগজপত্র শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা উচিত।
২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ মুহিউদ্দীন ফারুকী
![]() সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected] |