| প্রকাশ: ০৯:০০:২৫ AM, শুক্রবার, জানুয়ারী ২৪, ২০২০ | |
প্রজ্ঞাময় কোরআনের উপদেশগুলোতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা। রয়েছে মহান আল্লাহর নূর-আলো। যে আলোয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মাঝে যাকে চান পথ দেখান। এ উপদেশগুলোর ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে কোরআনের অপরিমেয় রহস্য ও বিস্ময়। কেন নয়, এ যে মহাপ্রজ্ঞাবান সর্বজ্ঞানীর বাণী। ‘এবং আপনাকে কোরআন প্রদত্ত হচ্ছে প্রজ্ঞাময়, জ্ঞানময় আল্লাহর কাছ থেকে।’ (সূরা নামল : ৬)।
আর সর্বোত্তম উপদেশ সেটিই যা উৎসারিত প্রজ্ঞার আধার থেকে, যা মোড়ানো থাকে মায়া ও দয়ার পোশাকে। এটি পুরোপুরি প্রতিভাত হয়েছে বান্দা লোকমানের বাণীতে আল্লাহ যা ব্যক্ত করেছেন। যে নেককার বান্দার কলবে উৎক্ষিপ্ত করেছেন তিনি প্রজ্ঞার ঝরনা। যেখান থেকে তার জিহ্বা প্রবাহিত হয়েছে মিষ্টতা ও সুবাস নিয়ে। ফলে তার প্রজ্ঞাদীপ্ত কথাগুলো মানুষের মাঝে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। কী চমৎকার এ প্রবাহ! কী আবেদনপূর্ণ এ পরিক্রমা! আল্লাহ তায়ালা কৃপাধন্য ও কৃতজ্ঞতাবদ্ধ বানিয়ে বলেন : ‘আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো শুধু নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সূরা লোকমান : ১২)।
এরপরই আল্লাহ তায়ালা পুত্রের উদ্দেশে লোকমানের উপদেশ উল্লেখ করেছেন। উপদেশগুলো বড় দামি ও উচ্চমার্গের। বিজ্ঞতাপূর্ণ ও আবেদনসম্পন্ন। যেগুলো বহু কল্যাণের সমষ্টি। মহত্ত্বের নানা দিক পরিব্যাপ্তকারী। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘(স্মরণ করো) যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বললো : হে প্রিয় বৎস, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা মহা অন্যায়।’ (সূরা লোকমান : ১৩)।
ফলত তিনি শুরু করেছেন বান্দার ওপর আল্লাহর হক দিয়ে। এটিই সবচেয়ে বড়, প্রধান ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হক। এটি হলো শিরকমুক্ত খাঁটি তাওহিদ। বান্দার জন্য এ হক আদায়ের বিকল্প নেই। অন্যথায় সে হবে ওই ব্যক্তির মতো যাকে মৃতভোজী পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। লোকমান (রহ.) শিরকের বিষয়টিকে বড় করে উপস্থাপন করেছেন। একে আখ্যায়িত করেছেন সবচেয়ে বড় জুলুম হিসেবে। কেননা এটি আসলে স্রষ্টা ও সৃষ্টকে সমান্তরাল বানানো। যার হাতে সব কিছু আর যার হাতে কিছু নেই দুটিকে এক কাতারে আনা। কীভাবে একজন মাখলুক আরেক মাখলুকের দাস হয় যে নিজেই নিজের ভালো-মন্দ করতে পারে না? মৃত, জীবিত বা পুনরুত্থিত করতে পারে না?
অতএব, হে মুসলিম, ওই সত্তার অনুগত হও, যিনি তোমাকে গোলামের গোলামি থেকে উদ্ধার করেছেন। তোমাকে মুক্ত করেছেন নিজেরই মতো আরেকজনের দাসত্ব থেকে। রক্ষা করেছেন প্রতিমার সামনে মাথা অবনত করা থেকে। আদি থেকেই তোমার জন্য বরাদ্দ করেছেন প্রকৃত সম্মান। সুতরাং, তোমার নিরঙ্কুশ ভালোবাসা তাঁর জন্যই বরাদ্দ কর। একমাত্র তাঁরই ওপর ভরসা কর। তাঁর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দাও তোমার চাওয়ার ওপর। তাঁর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টিকে তোমার অন্তরের কাবা বানাও। অবিরত যার তাওয়াফ করতে থাকবে। নিরন্তর যার ওয়াজিব আদায়ে নিবেদিত থাকবে।
আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর হকের পর বাবা-মায়ের হকের মতো কোনো কর্তব্য নেই। এজন্যই তিনি আল্লাহর তাওহিদের পর উল্লেখ করেছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচার এবং তাদের অবদানের শুকরিয়া আদায়ের কথা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভেধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দুই বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি, আমার প্রতি ও তোমার বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে।’ (সূরা লোকমান : ১৪)।
ইয়া আল্লাহ, কীভাবেই না সন্তানকে বাবা-মায়ের একটি হাত ধরে রাখে! একটি চোখ সুরক্ষা দেয়। একটি হৃদয় অস্থির বেচাইন থাকে। বাবা-মা হলেন উৎসর্গ ও আত্মত্যাগের উপমা। দায়িত্বনিষ্ঠা ও অনুগ্রহের উৎস। আর জননী তো অতিরিক্ত কষ্টের পর কষ্ট বহন করেন। ক্লান্তি-শ্রান্তি শুধু তার মমতাই বৃদ্ধি করে। জননী হলেন বংশের আধার ও গর্ভের ধারক। বরং গর্ভধারিণী হলেন জীবনের সৌন্দর্য ও জান্নাতের সৌরভ।
বাবা-মার হকের ব্যাপারটি এমন উচ্চতায় উপনীত যে তারা যদি সন্তানকে শিরকের দিকে আহ্বান করেন, তথাপি তাদের সঙ্গে সদাচার ও সঙ্গে থাকার হক বহাল থাকে। যদিও আল্লাহর অবাধ্যতা ও শিরকের ক্ষেত্রে তাদের আদেশ অমান্য। বাবা-মায়ের জন্য এমন সম্মানের পর আর সম্মান হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বাবা-মা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদের জ্ঞাত করব।’ (সূরা লোকমান : ১৫)।
লোকমান তার সন্তানকে বলিষ্ঠ উপদেশ দিয়ে চললেন। আবেগ, আবেদন আর মমতা মেশানো কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান, কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তর গর্ভে অথবা আকাশে অথবা ভূ-গর্ভে, তবে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ গোপন ভেদ জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।’ (সূরা লোকমান : ১৬)। অর্থাৎ ছেলেকে বুঝালেন, তোমার রবকে গোপনে-প্রকাশ্যে পর্যবেক্ষক জেন। তাঁর অপছন্দ ক্ষেত্র থেকে বেঁচে থাক। তাঁর পছন্দের ক্ষেত্রে সীমিত থেক। কেননা তিনি তোমাকে দেখছেন এবং অবলোকন করছেন। যত ছোট আর সূক্ষ্মই হোক না কেন, তাঁর কাছে কোনো গুপ্তই গোপন থাকে না।
লোকমানের উপদেশ ছিল একেবারে যথার্থ ও যুৎসই। তিনি নিজ সন্তানকে অসিয়ত সবচেয়ে বড় করণীয় দিয়ে শুরু করেছেন সেটি নিখাদ তাওহিদ। অতঃপর তাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন হৃদয়ের আমল। আল্লাহর কাছে যা সবচেয়ে সেরা ও সম্মানিত আমল। কেননা আল্লাহ রূপ বা আকৃতির দিকে তাকান না। তিনি আত্মা ও আমলের দিকে তাকান।
মুসলিম সম্প্রদায়, লোকমান হাকিম (রহ.) নিজ পুত্রকে উত্তম চরিত্র ও মহৎ মূল্যবোধ শেখাতে গিয়ে প্রথমে বিশ্বাস খাঁটি করা ও তাওহিদ নিখাদ করার বিষয়টি বলার পর শ্রেষ্ঠতম আমলের কথা বললেন। সেটি হলো সালাত কায়েম করা। তিনি বললেন ‘হে প্রিয়পুত্র, নামাজ কায়েম কর।’ (সূরা লোকমান : ১৭)। কেননা নামাজ মোমিনের নিদর্শন, ইবাদতকারীর প্রশান্তি, আল্লাহপাগলদের চোখের শীতলতা। শরিয়ত এই নামাজকে সুন্দরতম উপায়ে ও পূর্ণতর গঠনে প্রবর্তন করেছে।
আল্লাহর বান্দারা, লোকমান তার পুত্রকে ব্যক্তির হকে পূর্ণতা দেওয়া আমলগুলো নিয়ে অসিয়ত করার পর অন্যের হকের পূর্ণতা বিষয়ে উপদেশ প্রদান করেন। কেননা সেই তো শ্রেষ্ঠ, ব্যক্তিগতভাবে পূর্ণ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে পূর্ণতার অধিকারী। সেই উপদেশ হলো ‘সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর।’ (সূরা লোকমান : ১৭)।
এরপর তিনি বলেন, ‘আর বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।’ (সূরা লোকমান : ১৭)। আর এই উপদেশটি আল্লাহর পথের সব পথিকের জন্যই জোরালো নির্দেশনা। কেননা নামাজকে তার সব ফরজ-ওয়াজিব, রুকু-সিজদা ও নিষ্ঠাসহ আদায় করে পড়া ধৈর্য ও মোজাহাদার কাজ। এটি আল্লাহভীরুদের ছাড়া অন্যদের জন্য অনেক কঠিন। তেমনি সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধও অনেক ধৈর্যের কাজ।
এই উপদেশমালার শেষে এসেছে ব্যক্তির নিজস্ব ও অপরের সঙ্গে আদব ও শিষ্টাচারের প্রসঙ্গ। অন্যের সঙ্গে আদব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা লোকমান : ১৮)। এরপর এসেছে ব্যক্তির নিজের ক্ষেত্রে আদবের প্রসঙ্গ। যেমন তিনি বলেন ‘পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’
(সূরা লোকমান : ১৯)
১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ আলী হাসান তৈয়ব
![]() সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected] |