logo
প্রকাশ: ০১:২১:৪৩ AM, বুধবার, জানুয়ারী ২৯, ২০২০
আপনি কি আদর্শ নাগরিক?
শাহ মাহমুদ হাসান

একটি স্বাধীন জাতির দায়িত্ব কি হবে সে সম্পর্কে কোরআনে রয়েছে স্পষ্ট নির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তারা এমন লোক যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত প্রদান করবে এবং সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে।’ (সূরা হজ : ৪১)। এখানে আল্লাহ তায়ালা স্বাধীন মুসলিম জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা তুলে ধরেছেন। কোনো ভূখণ্ডে মুসলমাদের বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জিত হলে তারা সামাজিক জীবনে দুর্নীতি-দুষ্কৃৃতি, নাশকতা ও অরাজকতা সৃষ্টির পরিবর্তে নামাজ কায়েম করবে। তারা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় জাকাত প্রদান করবে। প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সৎ কাজের নির্দেশ প্রদান করার পাশাপাশি অসৎ কাজের মূলোৎপাটন করবে। এই দায়িত্বগুলো পালন করলেই তাদের জন্য আসমান থেকে নেমে আসবে কল্যাণ ও বরকতের বারিধারা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি কোনো জনপদের অধিবাসী ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের পতি আসমানী ও পার্থিব নেয়ামতগুলো উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সূরা আরাফ : ৯৬)। 
স্বদেশপ্রেম : সব নবী ও রাসুল নিজের দেশ ও জাতিকে ভালোবেসেছেন। স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি প্রেম ও মমত্ববোধ হচ্ছে নবীদের আদর্শ। পবিত্র মক্কার প্রতি ছিল আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অপরিসীম ভালোবাসা। চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে মদিনায় হিজরত করার সময় জন্মভূমি মক্কার পানে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলতেছিলেন, ‘হে মক্কা! প্রিয় জন্মভূমি আমার! তোমার শহর কতই না সুন্দর! যদি তোমার নিষ্ঠুর অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ (তিরমিজি : ৩৯৫২)। এই অভিব্যক্তির মাঝে মাতৃভূমির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। ইবরাহিম (আ.) এর দোয়ার মাঝেও ফুটে উঠেছে স্বজাতির প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ ও ভালোবাসা। কোরআনের ভাষায়, ‘যখন ইবরাহিম (আ.) বললেন, হে প্রতিপালক! এই ভূমিকে তুমি শান্তি দান করো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদের তরতাজা ফলমূল দ্বারা রিজিক দান কর। (সূরা বাকারা : ১২৬)। এখানে দেশ ও জাতির প্রতি ইবরাহিম (আ.) এর অগাধ ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতা ফুটে উঠেছে। দেশ ও জাতির প্রতি এই প্রেম-ভালোবাসার চেতনা লালন করা ঈমানের দাবি।
পরিবেশ সুরক্ষা : দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় সব নাগরিককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অহেতুক গাছপালা কাটা, বনাঞ্চল উজাড় করা ও প্রবহমান পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনি বনায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম  যে কোনো গাছই রোপণ করুক না কেন, তা থেকে মানুষ, পশু ও পাখিরা যা কিছু খায়, কেয়ামত পর্যন্ত তা তার জন্য সদকা হিসেবে অব্যাহত থাকে।’ (মুসলিম : ৪০৫৩)। তিনি বনাঞ্চল বাড়াতে এমনও বলেছেন, কেয়ামত হয়ে যাচ্ছে এমতাবস্থায়ও হাতে রক্ষিত গাছের চারাটি রোপণ করে দাও!
দেশ প্রতিরক্ষা : দেশের স্বধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের ঈমানি দায়িত্ব। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা হুমকির সম্মুখীন হলে ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন বাজি রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ প্রতিরক্ষায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করা প্রতিটি মুসলমানের জরুরি কর্তব্য। জাতীয় অখণ্ডতা রক্ষায় দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘দুটি চোখকে কোনোদিন জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না, যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে আর যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিয়েছে।’ (তিরমিজি : ১৬৩৯)। 
রাষ্ট্রের আনুগত্য : একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা, দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান মেনে চলা। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘শ্রবণ করা, অনুসরণ করা, মেনে চলা সুদিন ও দুর্দিনে সব অবস্থাতেই নাগরিকদের জরুরি কর্তব্য।’ (মুসলিম : ৩৪১৯)। সব ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা ও তা প্রশ্রয় না দেওয়া, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ইত্যাদি প্রতিরোধে প্রশাসনকে সহযোগিতা করাও নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নাগরিকের ওপর আরোপিত কর, জাকাত ও উশর প্রদান করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখাও একজন আদর্শ নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহৃত পণ্যগুলোর মধ্যে দেশীয় হালাল পণ্যকে বেছে নেওয়া দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে। 
নাগরিকদের জবাবদিহি : রাসুলে আকরাম (সা.) সব নাগরিকের নিজ নিজ দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছেন। এবং দায়িত্বশীলকে সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে উদ্বুদ্ধ করে বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রাষ্ট্রপ্রধান একজন দায়িত্বশীল, তাকে দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্বামী তার পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল। স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের সন্তানদের দায়িত্বশীল। সুতরাং তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (বোখারি : ২২৭৮)। দেশের সব নাগরিকেরই উচিত ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি সুখী, সমৃদ্ধিশালী ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। সুতরাং আসুন একজন আদর্শবান ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেষ্ট ও যত্নবান হই। 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]