| প্রকাশ: ১২:৩১:০৭ AM, বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ৩০, ২০২০ | |
আল্লাহ তায়ালা বিশেষ সম্মান প্রদানে কোনো স্থান ও এলাকাকে নির্বাচন করেন। তেমনিভাবে সে জন্য বিভিন্ন সময়, কাল এবং অধিবাসী ও সহযোগী নির্ধারণ করেন। তিনি পৃথিবীতে কিছু স্থানকে ফজিলত দান করেছেন, ফলে তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দেশ ও স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে। তিনি মক্কাকে ওহি নাজিলের স্থান, মুসলিমদের কেবলা, উম্মুল কুরা, নিরাপদ দেশ, মসজিদে হারাম এবং মোমিনদের হৃদয়ের কামনাস্থল বানিয়েছেন। অন্যদিকে নবী (সা.) এর হিজরতের মাধ্যমে মদিনাকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছেন। সেখান থেকেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। এটি পবিত্র নগরী। এর মাধ্যমে স্থান পবিত্র হয়েছে। এর দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান হারাম বা সম্মানিত। এটিই রাসুল (সা.) এর নিবাস এবং আশ্রয়স্থান। এটিই তার বাসস্থান এবং ঠিকানা। এটিই তার সমাধিস্থান।
আল্লাহ তায়ালা মদিনাকে মর্যাদাবান ও ফজিলতপূর্ণ করেছেন। তিনি তার নবীকে এখানে হিজরত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানকে সম্মানিত বা হারাম এলাকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এখানে বিদাতকারীকে অথবা যে তাকে আশ্রয় দেবে তাকে অভিসম্পাত করেছেন। অতএব, আপনারা এই মদিনার হক সম্পর্কে জানুন এবং এর সম্মানকে অনুভব করুন। আনাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘মদিনার এখান থেকে সেখান পর্যন্ত হারাম। এখনকার কোনো গাছ কাটা যাবে না, এখানে কোনো বিদাতি কাজ করা যাবে না, যে ব্যক্তি কোনো বিদাত করবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সব মানুষের অভিশাপ।’ (বোখারি)।
আমের বিন সাদ (রা.) এর বাবা থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি মদিনার দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী অংশের বৃক্ষলতা কাটা এবং এখানে কোনো প্রাণী শিকার করা হারাম ঘোষণা করছি।’ (মুসলিম)।
আলী (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘মদিনার আইর পাহাড় থেকে ছাওর পর্যন্ত হারাম এলাকা। এখানে যে বিদাত করবে অথবা তাকে আশ্রয় দেবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সব মানুষের অভিশাপ। তার কোনো ফরজ বা নফল আমল কবুল করা হবে না।’ (বোখারি)।
মদিনা হলো ঈমানের ঠিকানা। আল্লাহ তায়ালা একে দার ও ঈমান বলে নামকরণ করেছেন। এখানেই ধারাবাহিকভাবে কোরআন নাজিল হয়েছে। বিভিন্ন বিধান প্রণীত হয়েছে। ইসলামের রোকনগুলো সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নিরাপত্তা স্থিতিশীল হয়েছে। এখান থেকেই ইসলামের পতাকা অগ্রসর হয়ে অনেক দেশ জয় করেছে এবং আল্লাহ তায়ালা তার দ্বীনকে সুদৃঢ় ও সম্মানিত করেছেন, তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন, শত্রুকে পরাজিত করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় ঈমান মদিনায় সেভাবে ফিরে আসবে যেভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে।’ (মুসলিম)।
মদিনা হচ্ছে সুদৃঢ় ঢাল ও সুউচ্চ দুর্গ, যা তার আবর্জনাকে দূর করে দেয় এবং ভালোটাকে ধরে রাখে। এর প্রবেশ পথগুলোয় ফেরেশতারা পাহারা দেন। এখানে দাজ্জালের ভীতি ও আতঙ্ক প্রবেশ করবে না এবং প্লেগ ও মহামারি দেখা দেবে না। আনাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘মক্কা ও মদিনা ব্যতীত এমন কোনো শহর নেই যেখানে দাজ্জাল পদচারণ করবে না। এ শহরদ্বয়ের প্রতিটি প্রবেশ পথেই ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে পাহারা দেবে। অতঃপর মদিনা তার অধিবাসীদের নিয়ে তিনবার কেঁপে উঠবে এবং আল্লাহ তায়ালা সব কাফের ও মুনাফেকদের মদিনা থেকে বের করে দেবেন।’ (বোখারি)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মদিনার প্রবেশ পথগুলোয় ফেরেশতারা পাহারায় নিয়োজিত রয়েছে। এখানে প্লেগ ও দাজ্জাল প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম)।
মন্দ ও ধোঁকাবাজের স্থান মদিনায় নেই। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে কেউ মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে, সে লবণ যেভাবে পানিতে মিশে যায় সেভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে।’ (বোখারি)। তিনি আরও বলেন, ‘মদিনা হলো হাঁপরের মতো, যা তার আবর্জনাকে দূর করে দেয় এবং ভালোটা স্পষ্ট হয়।’ (মুসলিম)।
ইবরাহিম (আ.) মক্কাকে হারাম ঘোষণা করে তাতে বরকতের জন্য দোয়া করেছিলেন। আর রাসুল (সা.) মদিনাকে হারাম ঘোষণা করে এর জন্য ইবরাহিম (আ.) এর তুলনায় দ্বিগুণের দোয়া করেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় ইবরাহিম (আ.) মক্কাকে হারাম ঘোষণা করে তার অধিবাসীদের জন্য দোয়া করেছেন। ইবরাহিম (আ.) যেভাবে মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন আমিও সেভাবে মদিনাকে হারাম ঘোষণা করছি। আর ইবরাহিম (আ.) মক্কাবাসীর জন্য যেভাবে দোয়া করেছেন সেভাবে আমিও এখানকার মুদ ও সা-এর মধ্যে দ্বিগুণ বরকতের দোয়া করছি।’ (মুসলিম)। তিনি আরও বলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি মক্কায় যে বরকত দিয়েছেন মদিনায় তার চেয়ে দ্বিগুণ বরকত দিন।’ (বোখারি)।
মদিনা ছিল রাসুল (সা.) এর কাছে অন্যতম প্রিয় শহর। তিনি এই মদিনার প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশ করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, মদিনাকে আমাদের কাছে মক্কার মতো বা তার থেকেও বেশি প্রিয় করে দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সা ও মুদ-এর মধ্যে বরকত দিন। এর পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর করে দিন। আর এখানকার জ্বরের প্রকোপকে জুহফায় স্থানান্তর করে দিন।’ (বোখারি)।
আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) সফর শেষে ফিরে আসার পথে যখন মদিনার প্রাচীরগুলোর দিকে তাকাতেন, তখন তিনি এর ভালোবাসায় তাঁর বাহন উষ্ট্রীকে দ্রুত হাঁকাতেন। যদি অন্য কোনো জন্তুর ওপর থাকতেন তাকেও দ্রুত হাঁকাতেন।’ (বোখারি)। আর তিনি মদিনার দিকে আগমনকালে দ্রুত করতেন, উহুদ পাহাড় দৃষ্টিগোচর হলে বলতেন, এটা এমন এক পাহাড় যে আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি। তাবুক থেকে ফেরার পথে মদিনা দৃষ্টিগোচর হলে রাসুল (সা.) বলতেন, ‘এটা হচ্ছে তাবাহ, আর ওটা হচ্ছে উহুদ। উহুদ হচ্ছে এমন পাহাড় যে আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি।’ (মুসলিম)।
জিয়ারতকারীদের হৃদয় এই মদিনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাদের হৃদয়ে অনেক স্মৃতি রেখে দেয়। তারা মদিনা থেকে বিদায়কালে আবেগপ্রবণ হন।
মদিনা আপনাদের জন্য কল্যাণকর, তাই এ থেকে বিমুখ হবেন না। আপনাদের নবীর জন্য আল্লাহ তায়ালা এটাকে নির্বাচন ও পছন্দ করেছেন। অতএব আপনারাও তা পছন্দ করুন, যা তিনি পছন্দ করেছেন। প্রতিবেশিত্ব রক্ষার্থে আদবের খেয়াল করুন এবং এর অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হোন। ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যার পক্ষে সম্ভব সে যেন মদিনায় মৃত্যুবরণ করে। কেননা এখানে মৃত্যুবরণকারীদের জন্য আমি সুপারিশ করব।’ (তিরমিজি)।
নিশ্চয় মদিনার অনেক সম্মান-ফজিলত রয়েছে, সেগুলো অর্জন করুন। এর অনেক সম্মান, মর্যাদা ও আদব রয়েছে তা যথাযথভাবে জানুন। হারাম এলাকার সীমানার ভেতরে আদবগুলো রক্ষা করে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর রাসুল (সা.) এর মসজিদের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রাসুলের (সা.) সঙ্গে তার মৃত্যুর পর আদব রক্ষা করার বিষয়টি তার সঙ্গে তার জীবদ্দশায় আদব রক্ষা করার মতোই। তার সঙ্গে আদব রক্ষা করতে এবং নিচু স্বরে কথা বলতে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সামনে অগ্রণী হয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শোনেন ও জানেন। মোমিনরা! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না। এবং তোমরা একে অপরের সঙ্গে যেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বল, তার সঙ্গে সেরূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না। যারা আল্লাহর রাসুলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে শিষ্টাচারের জন্য শোধিত করেছেন। তাদের রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার। যারা প্রাচীরের আড়াল থেকে আপনাকে উঁচু স্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই অবুঝ। যদি তারা আপনার বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত সবর করত, তবে তা-ই তাদের জন্য মঙ্গলজনক হতো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা হুজরাত : ১-৫)।
অতএব আপনারা তাঁর কাছে সর্বোত্তম আদব বজায় রাখুন। সায়েব বিন ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা আমি মসজিদে দাঁড়িয়েছিলাম, এমতাবস্থায় একজন লোক আমার দিকে একটা ছোট পাথর নিক্ষেপ করল, তাকিয়ে দেখি ওমর বিন খাত্তাব (রা.)। অতঃপর তিনি বললেন, যাও, ওই দুজনকে ডেকে নিয়ে আস। আমি তাদের নিয়ে এলাম। তিনি ওই দুজনকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের বাড়ি কোথায়? তারা বলল, আমরা তায়েফের অধিবাসী। ওমর (রা.) বললেন, ‘যদি তোমরা মদিনার স্থানীয় লোক হতে, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের কঠোর শাস্তি দিতাম। কারণ তোমরা দুজন রাসুল (সা.) এর মসজিদে উঁ”ু আওয়াজে কথা বলেছ।’ (বোখারি)।
২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ মুহিউদ্দীন ফারুকী
![]() সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected] |