| প্রকাশ: ০৮:০০:২৯ AM, শুক্রবার, জানুয়ারী ৩১, ২০২০ | |
ইসলাম-পূর্বযুগে নারীদের সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা বলতে কিছু ছিল না। নারীদের প্রতি পুরুষদের ব্যবহার ও আচরণ ছিল অত্যন্ত নির্মম ও পশুসুলভ। তাদের চতুষ্পদ জন্তু ও পণ্যের মতো বাজারে বিক্রি করা হতো। ব্যভিচার ও অনাচারের জন্য বাধ্য করা হতো। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হতো। অনেক পুরুষ তো এ কথা ভাবতে বসেছিল যে, নারীরা বুঝি রক্তে-মাংসে গড়া কোনো মানুষ নয়, তারা এক ভিন্ন ধরনের জীব, যাদের আত্মা বলতে কিছু নেই। তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে শুধু পুরুষের সেবা করার জন্য। সে যুগে পুরুষদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করত নারীদের বাঁচা-মরা। অত্যাচার আর অবিচার মুখ বুজে সহ্য করতে হতো তাদের। সারাবেলা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সামান্য ভুলভ্রান্তি হলে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত হতো তাদের শরীর। মোটকথা সে সমাজব্যবস্থায় নারী জীবন ছিল মূল্যহীন এবং বিষাদ ও তিক্ততাপূর্ণ।
ইসলাম-পূর্বযুগে কন্যা সন্তানের প্রতি নিষ্ঠুরতা : আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন : ‘যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে বাঁচতে দেবে না, তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে। শুনে রাখ, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।’ (সূরা নাহল : ৫৮-৫৯)। অপর আয়াতে এরশাদ হয়েছে : ‘যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞেস করা হবে; কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।’ (সূরা তাকঈর : ৮-৯)।
উপরোক্ত আয়াতে কন্যা সন্তানের ব্যাপারে আইয়ামে জাহিলিয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। কন্যা সন্তানের জন্ম সেখানে অভিশাপ ও অপমানের বিষয় ছিল। যেন তা মহাপাপ বা স্থায়ী কলঙ্কের কারণ। কন্যা সন্তান জন্ম নিলেই নিষ্ঠুর-পাষণ্ড পিতা তাদের জনপদ থেকে দূরে কোথাও নিয়ে নিজ হাতে গর্ত করে সেখানে পুঁতে ফেলত। ওইসব শিশুকন্যার গগনবিদারী আর্তনাদে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠত, তবুও পিতার পাথর দিলে দয়া ও ভালোবাসার স্পন্দন হতো না। মানবতার কতটা অধঃপতন হলে মানুষ নিজের ঔরসজাত সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলতে পারে!
হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, জাহেলি যুগের লোকেরা কন্যা সন্তানদের দুটি পদ্ধতিতে হত্যা করত।
এক. তাদের স্ত্রীদের যখন সন্তান প্রসবের সময় হতো, তখন তারা তাদের একটি গুহার কাছে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিত। তারপর পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে জীবিত রাখা হতো। আর কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে গর্তে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো।
দুই. যখন তাদের কন্যা সন্তানদের বয়স ছয় হতো, তখন তারা সন্তানের মাকে বলত, তাকে তুমি ভালোভাবে সাজিয়ে দাও! আমি তাকে নিয়ে আমার আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাব। মা সাজিয়ে দিত। পিতা কন্যা সন্তানকে নিয়ে মরুভূমি দিয়ে দূরের কোথাও চলে যেত। তাকে কূপের ধারে নিয়ে এসে বলত, কূপের দিকে তাকিয়ে দেখ, বাবার কথায় কৌতূহলী মনে অবুঝ শিশু নিচের দিকে তাকাত, নিষ্ঠুর পিতা তখন তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে কূপের মধ্যে ফেলে দিত। তারপর মাটিচাপা দিয়ে অথবা পাথর মেরে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করত। (ফতহুল বারী : ১০/৪০৭)।
কন্যা সন্তান সৌভাগ্যের সোপান : এভাবে আইয়ামে জাহিলিয়াতে যুগ যুগ ধরে চলছিল নারীদের ওপর নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ও কন্যাসন্তান হত্যাযজ্ঞের পৈশাচিকতা। মহানবী (সা.) এর আগমনে মুক্তি পায় নারী জাতি। তিনি নারী ও পুরুষের সমমর্যাদার কথা বললেন। সমাজে যাতে নারীজাতির সম্মান ও মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় তার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঘোষণা দেন, ‘সাবধান! তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। কেননা তারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সাবধান! তোমাদের স্ত্রীর ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপরও রয়েছে তাদের অনুরূপ অধিকার। তোমাদের ওপর তাদের অধিকার এই যে, তোমরা উত্তমভাবে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে।’ (তিরমিজি : ১১৬৩)।
রাসুল (সা.) কন্যা সন্তানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি কন্যা সন্তানদের হত্যা করার জঘন্য প্রচলন হারাম করে দিয়ে বলেন : ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মায়ের নাফরমানি, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া, কারও প্রাপ্য না দেওয়া এবং অন্যায়ভাবে কিছু নেওয়া আর অপছন্দ করেছেন অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা, আর মাল বিনষ্ট করা।’ (মুসলিম : ২৪০৮)।
রাসুল (সা.) কন্যা সন্তানদের প্রতি দয়া করা, তাদের শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া, আদর যত্নসহকারে লালন-পালন করা এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে নেককার নারী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘কোনো ব্যক্তির যদি একজন কন্যা সন্তান থাকে এবং সে তাকে হত্যা করেনি, কোনো ধরনের অবহেলা করেনি এবং পুত্র সন্তানকে কন্যা সন্তানের ওপর কোনো ধরনের প্রাধান্য দেননি। আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (আবু দাউদ : ৫১৪৬)।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘যে লোকের তিনজন বাচ্চা থাকবে এবং সে তাদের যথাযথ ভরণপোষণ দিয়ে লালন-পালন করবে এবং আদর-যত্ন সহকারে গড়ে তুলবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতকে ওয়াজিব করে দেবেন। একথা শুনে এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, যদি দুজন কন্যা সন্তান থাকে, তাহলে কী বিধান হে আল্লাহর রাসুল? তখন তিনি (সা.) বললেন, দুজন হলেও একই বিধান। (সেও এ ফজিলতের অধিকারী হবে)।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৪২৪৭)।
কন্যা সন্তানকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা নয় বরং তাকে ভালোবাসা ও মূল্যায়ন করা নবীজির আদর্শ। রাসুল (সা.) স্বীয় কন্যা ফাতেমাকে প্রচণ্ডভাবে ভালোবাসতেন। ফাতেমার প্রতি তাঁর অন্তহীন ভালোবাসার কথা ঘোষণা দিয়ে বলেন : ‘ফাতেমা আমার কলিজার টুকরা! যে তাকে দুঃখ দেবে, সে যেন আমাকে দুঃখ দিল।’ (বোখারি : ৩৭১৪)।
নবীজি (সা.) যখন সফর থেকে ফিরতেন প্রথমে তিনি মেয়ে ফাতেমার কাছে যেতেন। তার গালে চুমু খেতেন। ফাতেমা (রা.) যখন রাসুলের কাছে আসতেন, তখন তিনি তার অনুরাগে কখনও দাঁড়িয়ে যেতেন। তাকে নিজের জায়গায় বসাতেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন : ‘যখন ফাতেমা (রা.) নবী (সা.) এর কাছে আসতেন তিনি তখন তার কাছে উঠে যেতেন, তাকে চুমু দিতেন এবং নিজের স্থানে বসাতেন। আর নবী (সা.) তার ঘরে গেলে তিনিও নিজের জায়গা থেকে উঠে তাঁকে (পিতাকে) চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। নবী (সা.) (মৃত্যুশয্যায়) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর কাছে এসে ফাতেমা (রা.) নবী (সা.) এর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়েন এবং তাঁকে চুমু দেন, তারপর মাথা তুলে কাঁদেন। আবার তিনি তাঁর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়েন, তারপর মাথা তুলে হাসেন। আমি (আয়েশা রা.) ফাতেমাকে নারীদের মধ্যে সর্বাধিক বুদ্ধিমতী হিসেবেই জানতাম; কিন্তু (তার হাসি দেখে মনে হলো) তিনি অন্যান্য নারীর মতোই একজন সাধারণ নারী। নবী (সা.) ইন্তেকাল করলে তাকে আমি প্রশ্ন করলাম, কি ব্যাপার! আপনি নবী (সা.) এর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লেন, তারপর মাথা তুলে কাঁদলেন, আবার ঝুঁকে পড়লেন, তারপর মাথা তুলে হাসলেন। কেন এরূপ করলেন? ফাতেমা (রা.) বললেন, তাঁর জীবদ্দশায় আমি কথাটি গোপন রেখেছি (কারণ তিনি গোপন কথা প্রকাশ করা সংগত মনে করতেন না)। আমাকে তিনি জানান যে, এ অসুখেই তিনি ইন্তেকাল করবেন, তাই আমি কেঁদেছি। তারপর তিনি আমাকে জানান যে, তাঁর পরিবারের লোকদের মধ্যে সবার আগে আমিই তাঁর সঙ্গে একত্রিত হবো। তাই আমি হেসেছি। (তিরমিজি : ৩৮৭২)।
মেয়ে ও বাবার মধ্যে কী অপূর্ব ভালোবাসা ও হৃদ্যতা! কন্যা সন্তানের প্রতি এমন ভালোবাসা ও স্নেহের ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। এখানে আনন্দে হেসে উঠে কন্যা শিশু। মুক্তি পায় নারী জাতি।
![]() সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected] |