logo
প্রকাশ: ০৮:০২:৩৫ AM, শুক্রবার, জানুয়ারী ৩১, ২০২০
করোনা ভাইরাস থেকে মোমিনের শিক্ষা
শায়খ আহমাদুল্লাহ

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ছড়ানো প্রাণঘাতী ভাইরাস নভেল করোনা এখন বিশ্ববাসীর জন্য আতঙ্কের বিষয়। কারণ চীন থেকে এরই মধ্যে ভাইরাসটি বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। চীনে বহু মানুষ মারা গেছেন, আক্রান্ত হয়েছেন হাজারো মানুষ। অথচ এ ভাইরাসের কোনো টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি। সাধারণ কোনো অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করে না। ভারত এবং নেপালেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। আমাদের মতো জনবহুল দেশে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে গবেষক ও চিকিৎসকরা ধারণা করছেন।
চীনের গবেষকদের মতে, এ ভাইরাস সামুদ্রিক মাছ কিংবা অবৈধভাবে শিকার করা বন্যপ্রাণী থেকে ছড়িয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা রুম : ৪১)। সুতরাং যে কোনো বড় দুর্যোগ, দুর্ভোগ দেখা দিলে নিশ্চিতভাবে জেনে নিতে হবে যে, তা মানুষেরই কোনো কৃতকর্মের ফল। পৃথিবীতে যত দুর্যোগ আসে তাকে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি। কারণ, এসবের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ অনুসন্ধান করি। কিন্তু ইসলাম বলে, দুনিয়ার বিপদ-আপদ, দুর্যোগের জন্য প্রাকৃতিক কারণের মতো নৈতিক কারণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। উপরোক্ত আয়াতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। 
চীনের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের প্রতি বহু বছর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে দেশটি। পুরুষদের বছরের পর বছর ধরে বিনা কারণে বন্দি করে নির্যাতন চালাচ্ছে এবং চীনা সৈনিক ও প্রশাসনের লোকেরা নারীদের তত্ত্বাবধানের নামে জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে। দুধের শিশুদের মায়েদের থেকে পৃথক করে রাখছে। কূটনৈতিক মসজিদ ছাড়া মুসলমানদের সব উপাসনালয় ভেঙে দিয়েছে এবং রাস্তাঘাটে মুসলিম মেয়েদের ওড়না ও হিজাব কেটে দিয়েছে, রমজান মাসে দিনের বেলায় পানাহার করতে মুসলমানদের বাধ্য করা হয়। এসব বিষয়ে বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বহুবার সচিত্র রিপোর্ট এসেছে। এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন ভেরিফাইড চ্যানেলের শত শত ভিডিওক্লিপ এসবের সাক্ষী। 
মহান আল্লাহ বলেন, ‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করো না, তাদের তো ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফারিত হবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪২)। আল্লাহর চিরাচরিত নিয়ম হলো জালিমের জুলুমের কিছু স্বাদ তাকে দুনিয়াতেই আস্বাদন করান, আখেরাতের শাস্তি তো আছেই। কখনও কখনও হয়তো জালিমের জুলুমের শাস্তি অনেকটা বিলম্বে দিয়ে থাকেন। তিনি ছাড় দিলেও ছেড়ে দেন না। সূরা মরিয়মে এরশাদ হয়েছেÑ ‘আর তোমার প্রতিপালক পালনকর্তা বিস্মৃত হওয়ার নন।’ (সূরা মরিয়ম : ৬৪)। 
মাজলুমের পক্ষে জালিমের বিরুদ্ধে আল্লাহ কখন কোন অদৃশ্য বাহিনী বা শক্তি প্রয়োগ করবেন সেটা তিনিই একমাত্র জানেন। যেমনটি করেছিলেন খন্দকের যুদ্ধের সময়। এরশাদ হয়েছেÑ ‘হে মোমিনরা! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদের তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।’ (সূরা আহজাব : ৯)। সূরা মুদ্দাসসিরের ৩১নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আপনার পালনকর্তার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন।’ 
আল্লাহ জালেমদের পাকড়াও করেন। সেটা কখনও মজলুমরা দেখে যেতে পারেন, কখনও পারেন না। কখনও খুব তাড়াতাড়ি পাকড়াও করেন, কখনও বহু পরে। কিন্তু পাকড়াও সাধারণত করেন। আর কাকে, কীভাবে, কোন অপরাধের কারণে পাকড়াও করবেন সেটা একমাত্র তিনিই জানেন। সুতরাং চীনের এই জাতীয় বিপর্যয় তাদের জুলুমের শাস্তি হতে পারে, আবার আল্লাহর অন্য কোনো হেকমতও থাকতে পারে। 
ইবনে মাজহায় বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা যখন দেখা দেয় এবং প্রকাশ্যে তারা অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তখন তাদের মাঝে প্লেগ (এবং মহামারি) দেখা দেয়।’ আজকের পৃথিবীতে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বৈশ্বিক বিপর্যয়ের এটিও অন্যতম কারণ।
ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে চীন সরকার গতকাল পর্যন্ত উহান শহর থেকে কাউকে বের হতে দিচ্ছে না এবং বাইরে থেকে কোনো লোককেও প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। চীন সরকারের এ সিদ্ধান্তের যথার্থতা সবাই অনুধাবন করছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ জাতীয় দুর্যোগে একই কর্মপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ করেছিলেন ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) আজ থেকে প্রায় দেড় সহস্রাব্দী আগে। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা কোনো এলাকায় প্লেগের (এবং মহামারি)  সংবাদ জানতে পারলে সেখানে প্রবেশ করবে না। আর যদি সে সময় তুমি সেখানে থাক, তাহলে সেখান থেকে মৃত্যু ভয়ে বের হবে না।’ (বোখারি-মুসলিম)। 
সুবহানাল্লাহ! মহানবীর সেই কৌশলের সঙ্গে আজকের চীনের কর্মপন্থা মিলে গেছে। অথচ মহামারির সময়ের জন্য তাঁর সেই নির্দেশনার হেকমত বা রহস্য এতদিন কেউ জানত না। আজ আবারও প্রমাণ হলো, তাঁর প্রতিটি নির্দেশ আসমানি নির্দেশনা থেকেই তিনি দিয়েছেন এবং তা মানুষের জন্য কল্যাণকর। যদিও তার প্রতিটি নির্দেশের কল্যাণকারিতা আমরা বুঝতে পারি না।
ভৌগোলিকভাবে চীনের খুব কাছাকাছি অবস্থান বাংলাদেশের। আমাদের এই জনবহুল এবং দরিদ্র দেশে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং করোনা থেকে বাঁচতে প্রথমত, চিকিৎসকদের সুরক্ষামূলক পরামর্শগুলো খুব গুরুত্বের সঙ্গে মেনে চলা উচিত। দ্বিতীয়ত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর শেখানো সকাল-সন্ধ্যার দোয়া ও রক্ষাকবচ জিকিরগুলো নিয়মিত পড়া উচিত। বিশেষ করে নিম্নোক্ত দোয়াগুলো বেশি বেশি পাঠ করলেও মহান আল্লাহ এই ভয়াবহ ব্যধি থেকে রক্ষা করবেন ইনশাআল্লাহ। 
(এক) ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনুনি ওয়াল জুযামি ওয়া ছাইয়্যি ইল আসকাম।’ অর্থ :  হে আল্লাহ অবশ্যই আমি তোমার কাছে ধবল, উন্মাদ, কুষ্ঠরোগ এবং সব ধরনের মারাত্মক ব্যাধি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (আবু দাঊদ, তিরমিজী ও নাসাঈ)।
(দুই) আল্লা-হুম্মা আফিনি ফি বাদানি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি সাম’ঈ, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাসারি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা। অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার শরীর সুস্থ ও নিরাপদ রাখ। হে আল্লাহ! তুমি আমার কান সুস্থ ও নিরাপদ রাখ। হে আল্লাহ! তুমি আমার চোখ সুস্থ ও নিরাপদ রাখ। তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ)।
(তিন) আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন মুনকিরাতিল আখলাক, ওয়াল আ’মাল ওয়াল আহওয়া, ওয়াল আদওয়া।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! অবশ্যই আমি তোমার কাচে দুশ্চরিত্র, অসৎকর্ম, কুপ্রবৃত্তি এবং কঠিন রোগগুলো থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (তিরমিজি)।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন গণইস্তেগফার। কোনো জাতির প্রতি আল্লাহর গণআজাব অবতরণের পথে দুটি অন্তরায় থাকে। এক. সে জাতির কাছে প্রেরিত নবী উপস্থিত থাকা, দুই. ইস্তেগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এরশাদ হয়েছেÑ ‘অথচ আল্লাহ কখনোই তাদের ওপর আজাব নাজিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের ওপর আজাব দেবেন না।’ (সূরা আনফাল : ৩৩)। 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]