logo
প্রকাশ: ০৭:৪৮:৫৭ AM, বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ৬, ২০২০
দাস থেকে সাহাবিদের সেনাপতি
মুফতি আবদুল হালিম

সালেম বিন মাকিল (রা.) পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন। আবু হোজায়ফার আজাদকৃত দাস হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। আবু হোজায়ফার (রা.) স্ত্রী সোবায়তা বিনতে ইয়ার (রা.) তাকে আজাদ করেছিলেন। কিন্তু সালেমকে (রা.) তারা খুব আদর-স্নেহ করতেন। তাই সালেম তাদের ছেড়ে দূরে কোথাও স্বাধীন হয়ে বসবাস করা পছন্দ করতেন না। এমন করতে তিনি রীতিমতো অস্বীকৃতি জানাতেন। পরে তাকে পালকপুত্র হিসেবে আবু হোজায়ফা (রা.) নিজের সঙ্গে রেখেছিলেন।
সালেম (রা.) যখন সাবালক হলেন, আবু হোজায়ফার অন্য স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.) নবী (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, সালেম এখন সাবালক হয়েছে। তার সঙ্গে আমার পর্দা করতে সমস্যা হচ্ছে। এ নিয়ে আবু হোজায়ফা সংকোচবোধ করছেন। নবী (সা.) বললেন, তাকে তোমার বুকের দুধ পান করিয়ে দাও। তাহলে সে তোমার মাহরাম হয়ে যাবে। তার সঙ্গে দেখা করতে সমস্যা হবে না। আবু হোজায়ফার সংকোচবোধ কেটে যাবে। তিনি তাকে দুধ পান করিয়ে দিলেন। উম্মুল মুমেনিন উম্মে সালামা (রা.) বলেন, সাবালককে দুধ পানের কারণে মাহরাম হওয়ার বিষয়টি সালেমের জন্যই নির্দিষ্ট। এটা অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য নয়।
এরপর থেকে আবু হোজায়ফা তাকে আপন পুত্রের মতো আদর-যত্ন করতেন। এ সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য আপন ভাতিজি ফাতেমা বিনতে ওয়ালিদের সঙ্গে তাকে শাদি দিয়েছিলেন। আবু হোজায়ফার (রা.) পালকপুত্র হিসেবে লোকেরা তাকে সালেম বিন আবু হোজায়ফা (আবু হোজায়ফার ছেলে) বলে ডাকত। তখন আল্লাহ তায়ালা তা নিষেধ করে আয়াত নাজিল করলেন, ‘তোমাদের পালকপুত্রদের তাদের পিতার নামে সম্বোধন করো। এটা আল্লাহর কাছে ন্যায্য।’ (সূরা আহজাব : ৫)। 
সালেমের কোরআন তেলাওয়াত ছিল সুমধুর। তিনি কোরআনে পারদর্শী ছিলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন তিনি সুমধুর কণ্ঠে মসজিদের ভেতর কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। শ্রুতিমুগ্ধ হয়ে আমি তা শুনছিলাম। নবীজি (সা.) আমাকে দেরি হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে এ জবাবই দিলাম। নবীজি চাদর নিয়ে তার তেলাওয়াত শুনতে বেরিয়ে গেলেন। দেখলেন, তেলাওয়াতকারী হচ্ছেন আবু হোজায়ফার আজাদকৃত দাস সালেম বিন মাকিল। তিনি তখন এভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন যে, ‘আলহামদু লিল্লাহ, তোমাকে তিনি আমার উম্মত বানিয়েছেন।’
নবী (সা.) এর আগেই ওমর (রা.) সহ অন্য সাহাবিদের সঙ্গে সালেম বিন মাকিল (রা.) মদিনায় ফিরেছিলেন। সেখানে গিয়ে মুহাজিরদের নামাজের ইমামতি করতেন সালেম বিন মাকিল (রা.)। এ সম্মানের কারণ ছিল তার কোরআনের জ্ঞান। নবী করিম (সা.) বলেছেন, চারজনের কাছে তোমরা কোরআন শিক্ষা করোÑ ‘আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, হোজায়ফার গোলাম সালেম, মুয়াজ বিন জাবাল, উবাই বিন কাব।’ (বোখারি : ৩৮০৮)। 
নবী (সা.) এর সঙ্গে তিনি সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবু বকর (রা.) এর শাসনামলে ১২ হিজরিতে মুরতাদদের সঙ্গে ইয়ামামার প্রান্তরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে মুহাজিরদের ঝান্ডা ছিল সালেমের হাতে। তুমুল যুদ্ধ শুরু হলে একপর্যায়ে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। সালেম (রা.) বললেন, ‘নবী (সা.) এর যুগে কখনও মুসলমানদের এমন ছত্রভঙ্গ হতে দেখিনি।’
যখন ইয়ামামার যুদ্ধে তার হাতে ঝান্ডা তুলে দেওয়া হলো, কেউ বললো, এটি সংরক্ষণের ব্যাপারে আমরা কিছুটা শঙ্কিত। কাজেই এমন-তেমন হলে আমরা অন্যের হাতে ঝান্ডা তুলে দেব। তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার দুর্বলতা প্রকাশ পেলে তো আমি কোরআনের নিকৃষ্ট বাহক বলে গণ্য হব। কাজেই কিছুতেই আমি এ ঝান্ডার অবমাননা হতে দেব না। তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেহের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে রক্ষা করেছিলেন।
প্রথমে আত্মরক্ষামূলক একটা গর্ত খুঁড়ে নিলেন। তাতে নেমে ডান হাতে ইসলামি ঝান্ডা উঁচু করে ধরলেন।
মুরতাদরা তার ডান হাত কেটে দিল। কিন্তু ঝান্ডাটি তিনি মাটিতে পড়তে দিলেন না। বরং বাম হাতে ঝান্ডা উঁচিয়ে ধরলেন। শত্রুরা তার বাম হাত কেটে দিল। এবার তিনি গলা দিয়ে ঝান্ডা চেপে ধরে কোরআনের আয়াত পড়তে লাগলেন, ‘মুহাম্মদ ছিলেন একজন রাসুল। তার আগে বহু রাসুল বিদায় নিয়েছেন। তিনি মারা গেলে বা নিহত হলে কি তোমরা মুরতাদ হয়ে কুফরিতে ফিরে যাবে?’ (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)। 
এভাবে তার একেকটা অঙ্গ দেহ থেকে ছিন্ন করে ফেলল শত্রুরা। মৃত্যুর আগে তার পাশের কাউকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আবু হোজায়ফার কী অবস্থা? 
বলা হলো, তিনি নিহত হয়েছেন।
কয়েকজনের নাম নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, অমুক-অমুকের কী অবস্থা?
বলা হলো, তারাও নিহত হয়েছেন।
তিনি বললেন, আমার মৃত্যু হলে আমাকে অমুক-অমুকের মাঝখানে দাফন করো।
যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, আবু হোজায়ফা ও সালেমের হাত-পা পরস্পরের মাথার কাছে পড়ে আছে।
তার মৃত্যুর পর সোবায়তার কাছে মিরাসের সম্পত্তি পাঠিয়েছিলেন খলিফা ওমর বিন খাত্তাব (রা.)। কিন্তু সোবায়তা তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, তার ব্যাপারে কোনোরূপ দাবি না রেখে সম্পূর্ণভাবে তাকে আমি গোলামি থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম। কাজেই তার মিরাস আমি নেব না। তাই খলিফা সেগুলো বায়তুল মালে জমা দিয়েছিলেন। ওমর (রা.) তাকে এতই সমীহ করতেন যে, নিজের মৃত্যুর প্রাক্কালে বলেছিলেন, আজ হোজায়ফার গোলাম সালেম যদি জীবিত থাকত, তাকে আমার মজলিসে শূরার সদস্য মনোনীত করতাম। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/১৪১, উসদুল গাবা : ২/৩৮২, ইবনে সাদ : ৩/৮৫)। 

লেখক : ইমাম ও খতিব, টঙ্গী রেলস্টেশন 
পুরাতন জামে মসজিদ

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]