ব্যস্ত এ শহরের অলি-গলিতে কত মানুষের বাস। কেউ ছুটছে, ক্লান্ত শরীরে কেউবা ফিরছে আবার কেউবা চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে। এ শহরে বেঁচে থাকাটাই যেন একটি যুদ্ধ। এ হলো জীবনযুদ্ধ। শহরের এক ব্যস্ততম এলাকা ঢাকার নিউমার্কেট। সবার ব্যস্ততার ভিড়ে মার্কেটটির পশ্চিম পাশে বইয়ের দোকানগুলোর সামনের ফুটপাতে সকাল-বিকাল দেখা যায় টেপখাওয়া পুরনো অগণিত সিলভারের কলসি। কলসিগুলোর ভিড় ঠেলে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ Ñ ওরে ও নাতি, কলসির টাকাটা দিয়ে যাইস কিন্তু, ওরে পেটের কেউই তো আর আপন না, রক্তের সম্পর্ক বলে আবার কিছু আছে নাকি, সবাই স্বার্থপর, সবাই চলে যায়, দুনিয়াতে পোলাপাইনও আপন না কেউই আপন না, দুনিয়াটাই যেন এক লঙ্গরখানা। কথাগুলো কানে আসতেই কিছুটা কৌতূহলে এগিয়ে যাই তার কাছে। গিয়ে দেখি দুপুরের শীতের রোদে সত্তরোর্ধ্ব এক পৌঢ় মহিলা ভাত খাচ্ছেন আর আপন মনে কথা বলেই যাচ্ছে। জানতে চাইলাম তার জীবনের গল্প। অনেকটা আক্ষেপের সঙ্গেই বলতে লাগলেন, ‘কি হইবো আর শুইনা, কিছুই তো নাই এহন আমার। একসময় সব আছিলো, স্বামী আছিলো, পোলাপাইন আছিলো, এখন কেউই নাই, পোলাপাইন যে হের হের মতো থাকে, বুড়ি মায়ের খবরটাও কেউ নেয় না।’ জানতে পারলাম, উনার নাম হায়াতুন নেসা। কামরাঙ্গীরচরের বস্তিতে একটি ঘর ভাড়া করে একাই থাকেন। কথা বলে বোঝা যায় একসময় সচ্ছল পরিবারেই তার বাস ছিল। স্বামী চলে যাওয়ার পর, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে তিনি মোটামুটি ভালোভাবেই বড় করেছেন। কিন্তু ছেলেরা বিয়ের পর আর মায়ের কোনো খবর নেন না ও মেয়ে শ্বশুরবাড়ী থাকেন, অনেক দিন ধরে তিনিও যোগাযোগ করেন না। বার্ধক্য ভর করলেও নিজের মনোবল হায়াতুন নেসাকে একটুও দমাতে পারেনি। তিনি পারিবারিক অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। নিজের জমানো ৪০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছেন নিউমার্কেটে পানির ব্যবসা। কিনেছেন পানি টানার ঠেলা গাড়ি ও অগণিত সিলভারের কলসি। নিউমার্কেটের বিভিন্ন দোকানের প্রয়োজনীয় পানি বিক্রি করে কর্মচারীর বেতন দেন ও তিনি মাসে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা উপার্জন করে নিজের খরচ চালান। এখন আর ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে থাকতে না পারার জন্য আফসোস করেন না। বরং সারা দিন বিলাপ করেন আর সবাইকে বলেন দুনিয়াতে কেউই আপন না। তাই নিজের জীবনের কঠিন মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হও।
প্রবীণ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
